Sunday, 8 November 2026

বোধের নির্বাসন

ছেলেটির আজকে অনেক মেজাজ গরম। শুধু আজকেই না, বাইরে বের হলে প্রায়ই এমন মেজাজ খারাপ থাকে। বাসা থেকে বের হলেই দুনিয়া তার কাছে জাহান্নাম মনে হয়। মা-বাবাকেও এটা নিয়ে বলে লাভ নেই; তাদের ধারণা, জেন জি বলেই সবকিছুতে মাথা গরম হয়ে যায়। আর এটা শুনলে আজিজের মাথা আরও আগেই গরম হয়। এক তো বাইরের জ্বালা, এই দিকে আবার মা-বাবার এমন পক্ষপাতধারার চিন্তা। সব মিলিয়ে মনে হয়, এই দেশটাই আসলে অদ্ভুত। সকাল-বিকাল সবাইরে আক্কেল নিয়ে জ্ঞান দেওয়া উচিত।

রাস্তায় বের হলেই কেউ গায়ে এসে পড়ে, কেউ বা হাঁকডাক দিয়ে চিল্লায়, কেউ মনে হয় এই বুঝি তার বাহনটা শরীরে তুলেই দিচ্ছে। ফুটপাতেও শান্তি নাই।

সবকিছুতে বিরক্তি চলে আসে। কিছু কিছু ইতর ধাঁচের বান্দা টিটকারি করে বলে, তুই এর থেকে ভালো দেশ ডিজার্ভ করিস। এই যে আমাদের স্বজাতির একটা বড় সমস্যাই হচ্ছে, নিজের সমস্যা না দেখে বরং অন্য কিছু দিয়ে নিজের দোষগুলা ঢেকে ফেলা। এখানে প্রতিটা সমস্যাকেই আসলে গর্ব বা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে ভাবা হয়, কিংবা যে ভুক্তভোগী, তার ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়।

ওই দিনের ঘটনা, মহল্লা দিয়ে যাচ্ছি। পথে প্রচুর হট্টগোল; এগুলা দেখলে আগ্রহ তো জাগেই না, বরং যারা এগুলা করে, ওদেরকে দিনে তিন বার থাপড়াইতে মন চায়। পাশ দিয়ে যেতে যেতে যা বুঝলাম, হট্টগোল আসলে একটা মেয়ে আর কিছু ছেলে। মেয়েকে টিজিং করা হয়েছে, আর মেয়ে প্রতিবাদী হওয়াতেই বিপত্তি ঘটছে। কেন সে প্রতিবাদ করল, কেন বা সে বুকে ওড়না না জড়িয়ে বের হয়েছে। ছেলেদেরকে বাঁচানোর জন্যেও কেউ কেউ পক্ষ নিয়েছে। মাঝেমাঝে মন চায়, এমন সব শালাদেরকে বাঁশ দিয়ে পিটাই। জানোয়ারগুলা নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য ওই আরেকটা ঘটনা যোগ করে, সাথে এমন আরও কিছু জানোয়ার তাদেরকে উৎসাহ দেয়। অথচ কেউ তাদেরকে বলে না, কেন তারা নিজেদের চোখ হেফাজত করে নাই।

এমন সব সমস্যার জন্ম প্রতিদিন। বাসে উঠলে কেউ ফোন টিপতে থাকলে বা কারও সাথে চ্যাট করতে থাকলে, বাকিদের যেমনেই হোক, কী চ্যাট হচ্ছে তা জানা জরুরি। না হলে যে তার মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। এই যে আমাদের লাখ লাখ টাকা খরচ করে মানুষ বানানোর মিশনে নামানো হয়, তার আগে আমাদেরকে হাজার টাকা খরচ করে আক্কেলবান বানানো বেশি জরুরি। না হলে আমরা যে হুটহাট অন্যকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেই, এবং সেটা যে খুব খারাপ, সেটা বোঝার মতো আক্কেলও আমাদের হয় না।

আজিজ প্রতিদিন এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে নিজেও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। হুটহাট রেগে যাওয়া, কিছু হলেই অন্যের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া।

আর এই আচরণ নিয়ে তার মা-বাবাও বিরক্ত। এই তো গত সপ্তাহের ঘটনা, একটা ছেলে তাকে গালি দিয়েছে বলে তার গাল থেতলিয়ে দিয়ে এসেছে। পরে এটা নিয়ে বিরাট হট্টগোল বেধে যায়। ওই ছেলের বাবা এলাকার পাতি নেতা, তাই ছেলের এই মাইর খাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। এর জন্যে যত রকম ঝামেলা করা দরকার ছিল, সবকিছু প্রস্তুত করেই এসেছে আজিজকে বুঝানোর জন্যে। কিন্তু আজিজের বাবা-মায়ের একান্ত প্রচেষ্টা আর বুদ্ধিমত্তার কারণেই এই যাত্রায় আজিজ বেঁচে যায়, যদিও এর জন্যে তার মা-বাবাকে মূল্য দিতে হয়েছে। ছেলের হয়ে মুচলেকা আর চিকিৎসা খরচ বাবদ ওই পাতি নেতার হাতে এক লাখ টাকা তুলে দিতে হয়েছে।

এত মানুষ আর পাতি নেতার হুংকার দেখে আজিজ ঘাবড়ে গেলেও, বাবা-মায়ের এমন আকুতি-বিনুনি তাকে বেশ বিরক্ত করে তোলে। আবার ওই অবস্থায় নিজেকে খুব অসহায় অবস্থায় দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না।

সবকিছু যখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে প্রায়, তখন আজিজের বাবা-মা তাকে ডেকেছে কথা বলার জন্যে। যদিও শেষের কিছুদিন তারা তিনজন এক বাসায় থাকলেও, প্রয়োজন ছাড়া কারও সাথে কারও ওইভাবে কথা বলা হয়ে ওঠেনি। যেন অলিখিত একটা মৌন চুক্তি হয়েছে কথা না বলার।

এ মুহূর্তে বাবা-মা যা যা বলবেন, তা মেনে নিতে হবে ভেবেই আগে থেকেই চুপ থেকেছে আজিজ। যদিও অযৌক্তিক কিছুই বলে নি তার মা-বাবা। এজন্যে অবশ্য আজিজের মধ্যে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছিল।

"যে তুমি সবাইকে নিয়ে বিরক্ত, সবকিছু নিয়ে বিরক্ত। সে তুমিও তো এখন বিরক্তির কারণ হয়েছো। নিজের মধ্যেও যে ধৈর্যশক্তি বলে কিছু রাখো নি। শেষে এমন এক জায়গায় গ্যাঞ্জাম বাধিয়েছ, একটুর জন্যে আমরা সবাই বিপদে পড়তে যাচ্ছিলাম।"

তাঁদের মুখে এমন কথা যৌক্তিক, এটা নিয়ে তর্ক করার জায়গা থাকলেও চুপ থাকাটাই উত্তম মনে হয়েছে আজিজের কাছে।

আসলে এমন অসহিষ্ণুতা আর অস্থিরতা যে কোনো মানুষকেই বদরাগী আর ক্ষিপ্ত করে তোলে। মানুষগুলা আস্তে আস্তে সব কেমন হয়ে যায়। না চাইলেও যেন কোথায় কারও সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে যেতে হয়।


বোধের নির্বাসন

মাহতাব হোসেন 

মাহতাবের ডায়েরি 

০৮-১১-২৬