Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Friday, 14 April 2017

আমি উই- ছোট গল্প

উই 
আমার নাম, জন্মসূত্রে ঢাকাইয়া হলেও পূর্বনিবাস বিক্রামপুরে। আমার দাদার দাদা তারও দাদার দাদা একদিন হুট করে কাউকে না বলে এক মিষ্টিঅলার হাত ধরে ঢাকায় পাড়ি জমায়। যদিও সে পিতামহ জানতেন না আসলে তিনি কোথায় যাচ্ছেন পরে অবশ্য এখানে মানুষের মুখে শুনে-বুঝে জানতে পারলেন তিনি বড্ড একটি শহরে- খুব উঁচু একটি দালানে আছেন। কুয়ো ঘরে বেড়ে উঠা ছোট পৃথিবী থেকে উঠে আশা সে বিস্ময় পুরুষের জানা ছিলো না পৃথিবীর আয়তন তার দেখা পৃথিবী থেকেও বিশালাকার। নতুন শহরে এসে তার কাছে সব কিছুই নতুন ঠেকছে। থাকার জন্যে দামী দামী জিনিষে নিজেকে মানিয়ে নিতে কিছু সময়ও লেগেছিলো তাঁর। ভদ্র পুরুষটির অভিজ্ঞতার আলোকে এখানের প্রতিটা আসবাবপত্রও তার কাছে নতুন লাগছে। খাদ্যাভাসের স্বাদেরও রয়েছে নতুনত্ব। এখানে এসে তাঁর প্রথন মনে হলো, গ্রামের চাষাভূষা আর শহুরে মানুষে কিছু পার্থক্য রয়েছে যা বহুকাল থেকে এই দু শ্রেনীকে পার্থক্যের আড়ালে বিভক্ত করে রেখেছে।

এতক্ষণে মাথায় উঁকিঝুঁকি ঘটতে পারে এই কিচ্ছা কাহিনীর ইতিহাস নিয়ে, কিভাবে এতো পুরানো কিচ্ছা আমার জানা। উঁকিঝুঁকি না আসলেও ব্যাপারগুলো জেনে রাখা ভালো, পরিবারের এই কিচ্ছা গুলো একটা রিচুয়াল পর্যায়ে ঠেকেছে। যার দ্বারা এই শহরে আমাদের গোড়াপত্তন তাঁর কাছ থেকে কিচ্ছা গুলো পরবর্তীতে তার নাতি নাতনি জেনেছে, এভাবে এক নাতি নাতনি থেকে অন্য নাতি নাতনিতে চলে এসেছে, যুগে যুগে চলে আশা কিচ্ছা গুলো আমরাও অন্যসব বংশধরদের মতো শুনে এসেছি। অতীতের আর সবার মতো আমরাও কিচ্ছাগুলো শুনে শিউরে উঠেছি। সাধারণত এরকম কাজে প্রচুর সাহসিকতার প্রয়োজন পড়ে। কিচ্ছা গুলো আমাদের কাছ থেকে শুনে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও বড় হবে। তাদেরও শিউরে উঠার অনুভূতি হবে, শুনার পর পূর্বপুরুষসে ভক্তি আর শ্রদ্ধাবোধে মাথায় তুলে রাখাতেও কার্পণ্যবোধ আসবে তাতে। এই সাহসী কাজের জন্যে তাদের মধ্যেও গর্ববোধ হবে যেমনটি এখন নিজের মধ্যেও হচ্ছে। পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোও এমন গর্ববোধ নিজেদের মনে পুষে রাখতেন বলে মনে হচ্ছে।

‘উই’ নামটা নিয়ে কারো কারো প্রশ্ন বা জানার ইচ্ছেও থাকতে পারে, সাথে বয়সটাও। আবার এমনও হতে পারে নামটাকে সামান্য ব্যাপার ভেবে কেউ বা নিজের মধ্যে ইচ্ছেটাকে জাগতেও দিতে চাইবেন না। তবে সত্যি বলতে আমার নামের অর্থ কি, তা আমি দূরের কথা আমার বাবাও হয়তো এখনো জেনে উঠতে পারেননি। ভাসা ভাসা ভাবে জেনেছি আমাদের জাতের সাথে মিল রেখেই আমার নাম রাখা হয়েছে তখন। বহুবার ইচ্ছে হয়েছে অবশ্য এখনোও হচ্ছে বাবা মাকে জিজ্ঞেস করি- ‘উই’নামের মাজেজা কি কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারি নি, পারছিও না। প্রশ্ন করতে যাওয়ার আগেই নিজের মধ্যে এক প্রকার আড়ষ্টতা কাজ করে। যৌবনে ছেলে মেয়েদের মধ্যে এমন এক ধরণের আড়ষ্টতা কাজ করে যা তাকে কারো সাথে কথা বলতেও ইতস্ততায় ভুগায়। নিজের মধ্যে এমন কিছুই দেখা দিয়েছে কিনা তা বুঝা বা জানার চেষ্টাও করি নি কখনো।

আমাদের এই বিশাল তিন বেডের বাসায় আমরা মাত্র চারজন প্রানী। বাবা, মা, ছোট বোন ইকু আর আমি। অন্যান্য প্রানীর মতো আমাদেরও পড়ার বিশেষ একটা পদ্ধতি রয়েছে। আমাদের পদ্ধতিটা অবশ্য একটু অন্যরকম। এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না বরং এখন পরিবারের কথা বলতে মন চাচ্ছে- 

 ইডেক হলেন আমার বাবা। তাঁকে আমি আমার আইডল হিসেবে জানি। মানুষ সম্পর্কে তার কতো তত্ত্ব-জ্ঞান, বাবার কাছ থেকেই শিখেছি কিভাবে মানুষের সাথে ডিল করতে হয়। কিভাবে একটা মানুষকে বিরক্ত না করে তার কাছ থেকে প্রাপ্যটা আদায় করে নিতে হয়। বাঁচার জন্যেও জগতে বহু তত্ত্ব শিখতে হয়। তত্ত্বগুলো সব মৌখিক আর ব্যবহারিক, লিখিত তত্ত্বে এখানে অনীহা রয়েছে। এক রীতিতেই সবাই এখানে শিক্ষা নিয়েছে। বাবা তার বাবার কাছ থেকে, বাবার বাবা মানে আমার দাদা তাঁরও বাবার কাছ থেকে শিখে নিয়েছে। মৌখিক আর ব্যবহারিক তত্ব ছাড়া এখনে অন্য কোন তত্ব নেই; আমাদের স্বরণশক্তিও খুব তীক্ষ্ণ তাই সহজে কোন কিছু ভুলারও নয়। 

আমার মায়ের মধ্যে বাবার মতো অতো গুন নেই। বাবা তাঁকে বোকা বললেও তাঁর মধ্যে বেঁচে থাকার নিজস্ব কিছু কৌশল রয়েছে যা বাবাও আজ পর্যন্ত আয়ত্ম করতে পারেন নি। জগতে বাঁচার জন্যে অনেক বুদ্ধিমান বা চালাক হওয়ার প্রয়োজন নেই, তা আমার মা ফিরেক্স’কে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। ইকু অবশ্য মায়ের মতো হয় নি মোটেও বরং বয়সে ছোট হলেও তার মধ্যে রয়েছে নানারকম চালাকি কৌশল যা দিয়ে সে সহসায় যে কাউকে গায়েল করে দিতে পারে।

পূর্বপুরুষদের সুবিধা আর নিরাপত্তার কথা ভেবে বারে বারে এই শহরে থাকার স্থান পরিবর্তিত হয়েছে বংশধরদের মধ্যে। সর্বশেষ আমরা যে বাড়িতে এখন উঠেছি তার নাম ‘ফিলিকা গার্ডেন’। বাড়ির সম্মুখভাগ ঢুকতেই প্রাচীরের গায়ে চীনা মাটির খোদাই করা বড় বড় অক্ষরে লেখা বাড়ির নামটি। প্রথম দর্শনে যে কারো চোখে পড়বে চীনা মাটিতে লেখা বড় বড় অক্ষরগুলো। ঠিক আজ থেকে দশদিন আগে আমরা উঠেছি ‘ফিলিকা গার্ডেন’ এ। হুট করে একদিন দাদা-দাদীর মর্মহত দুর্ঘটনার পর বাবা দুঃখে কষ্টে আগের বাড়িটা ছাড়তে বাধ্য করেন বাড়ির সবাইকে। ওই বাড়িতে বহু আগ থেকেই আমাদের থাকা, দাদার কৈশোরে ওই বাড়িতে তার বাবা মায়ের হাত ধরে উঠেছেন। তারপর থেকে দশদিন আগ অবদি আমাদের ওখানে থাকা। কতো স্মৃতিই না ওই বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে জড়ো হয়ে আছে। সুঃখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সব মিলিয়ে জীবন খুবই অদ্ভুত। ক্ষুদ্র এই জীবনে কতো কিছুর সাথেই না মোকাবেলা করতে হয়- 
স্মৃতি কখনো মনে করতে নেই, তাতে এক ধরণের ছাপা কষ্ট অনুভূত হয় একটু বাতাসেও কষ্টগুলো হু হু করে কেঁদে উঠে।

আমাদের নতুন এই বিশাল বাড়িতে আরেক পরিবারও থাকে, মজার বিষয় হলো আমাদের মতো মিলিয়ে দেখলে তারাও সংখ্যায় চার। এই অল্প কয়দিনে ওই পরিবারের প্রতি আমাদের আস্থা গড়ে উঠেছে। এতো নিরিহ আর নিরিবিল ভদ্র পরিবার আমি আগে কখনো দেখি নি। অত্র পরিবারের কর্তা কি করেন তা আমার জানা নেই। তাঁকে সাপ্তায়ে ছয়দিন ঘুম থেকে উঠে অফিসে ছুটতে দেখি। নিশ্চয়ই বড়সড় কোন অফিসের উদ্ধতন কর্তা হবেন আচার আচরণ,অর্থ- প্রাচুর্য দেখে তাই অনুমেয়। 

প্রথম দেখাতেই বাড়ির ভদ্র মহিলাকে যে কারো অলস স্বভাবের মনে হতে পারে, প্রকৃত অর্থে সে এমনই। সারাদিন বাসায় বসে ঝিমায় আর টিভি দেখে অবশ্য অন্যকোন উপায়ও নেই। সংসারে কাজ করার জন্যেও কিছু থাকে না। দু-বেলা আয়া-বুয়া এসে সবকিছু করে রেখে যায়। আমাদের ছোটটা মাঝে মাঝে এই ভদ্র মহিলাকে জ্বালাতন করতেও ভুলে না। ঝিমাতে থাকা অবস্থায় ইকু তার গাঁ ঘেঁসে তাকে ছোট একটা কামর দেয় এতে মহিলা আচমকা চমকিয়ে উঠেন। দেখে নিজের হাসি চেপে রাখতে কষ্ট হয়। মহিলার করুণ মুখখানা দেখে তখন অবশ্য হুট করে মায়া জাগে নিজের মধ্যে। নিখাত ভদ্র দেখেই কিছু বলেন না মহিলা নাহলে ইকুর বাচ্চামি গুলো মেনে নেয়ার মতো ছিলো না।

এই পরিবারে যে দুই-বাচ্চা রয়েছে তার মধ্যে ছোট বাচ্চাটা ক্লাস সিক্সে পড়ে তার নাম রোমেন তাকেও হস্তনস্ত করতে ইকু ভুলে না। অন্য যে বাচ্চাটি রয়েছে তাকে অবশ্য বাচ্চা বললে ভুল হবে। আদর ভালোবাসা আর বড় সন্তান বলে পরিবারের কাছে সে বাচ্চা হতে পারে আদতে সে বাচ্চা নয়। তার নামেই এই বাড়ির নামকরণ করা হয়েছে। ফিলিকা- সে ক্লাস নাইনে পড়ে। এ বয়সে অন্য সব মেয়ে-ছেলের মতো তারও যৌবনের শুরুটা হয়েছে। আঁকা বাঁকা করে চলা, চলনা নিয়ে কথা বলা, কোন ছেলেকে দেখলে বার বার আড় চোখে তাকানো, চেহারায় বিশেষ লাবণ্য ভাব ফুটে ওঠা আর বাতাবী লেবুর মতো ছোট ছোট স্তন গুলোর জেগে ওঠা সব মিলিয়ে যৌবনের শুধুর লক্ষণ গুলো তার মধ্যে রয়েছে।

ইডেক ছোট বেলায় তার ছেলে মেয়েকে কিছু বিধি নিষেধ শিখিয়েছে যা জীবন যুদ্ধে চলতে গেলে সবার মান্য করা উচিৎ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর সব কিছু এখনো তীক্ষ্ণভাবে সঞ্চালন করে রেখেছে উই কিন্তু তারপরেও তারমধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। বাবার বিধি নিষেধ গুলো এমন ছিলো, ‘মেয়ে-ছেলের ব্যক্তিগত স্থান গুলোর দিকে তাকাতে নেই, সে গুলো স্পর্শ করা বা তাতে কামড় বসানো খুবই জগন্যতম কাজ। কাজগুলো থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। এখানে আশার পর গত তিন-চার দিন থেকে বাবার কথায় অনড় থাকতে পারছে না উই। সামনে পারবে কিনা তা নিয়েও যথেষ্ট সন্ধিহান দেখা দিয়েছে তার মধ্যে। এই স্থানে আশার আগে ইউ কখনো তার বয়সী রূপবতী-সুন্দরী মেয়ে দেখে নি, দেখলেও বা ওভাবে কখনো চোখ মেলে তাখানোর ইচ্ছে জাগে নি। ইতিমধ্যে একটা কারনে উই’র মনে হিম বাতাস বয়ে যাচ্ছে যে বাতাস শুধু মাত্র রক্তস্রোত দ্বারাই বন্ধ হতে পারে। হিম বাতাস বয়ে যাওয়া কারণটা নিয়ে উইয়ের মনে নানা চিন্তা। একা একা ভেবে কোন কিছুর কূল কিনারা পাচ্ছে না সে, তাদের দুজনের বয়স ই প্রায় কাছাকাছি অথচ দু’জন দু মেরুতে বাস করছে। হিসেব করলেও দেখা যাবে দু’জন একই ক্লাসে পড়ছে কিন্তু দুজনের পড়ালেখার ধরণেও কতো ভিন্নতা। পড়ার জন্যে ফিলিকাকে কতো কাঠামোর মধ্য দিয়েই না যেতে হয় কিন্তু উই বেচারা, তার কাজ হচ্ছে বাবার কাছ থেকে আর পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বশিক্ষিত হয়ে বেঁচে থাকা। শরীরের লেনদেনেও দুজনে কতো পার্থক্য-এই বয়সে ফিলিকা চায় তার ক্লাস টেন’এ পড়া লিকলিকে শুকনা গড়নের ছেলে বন্ধুটিকে কাছে পেতে। যার শরীরের উষ্ণতায় সে নিজেকে অন্যজগতে খুঁজে পেতে চায় আর একই সময়ে উই চায় টগবগে তরুণীর চঞ্চলা দেহের রক্তের ঘ্রাণ। 

গত দু’দিন আগে উই কি দেখেছে যার জন্যে তার মধ্যে শান্ত ভাবখানা নিমিষেই দুমড়ে মুছরে ভেঙ্গে যাচ্ছে! যে কখনো বাবার কথায় অবাধ্য হয় নি সে কিনা উষ্ণ রক্তের খেলায় মেতে উঠেছে। যেদিনের ঘটনা নিয়ে তার মনে নানা রকম উঁকি ঝুঁকি সেদিন বিকেলে কোন এক বিশেষ কারনে উই’কে বাড়ির ছাদে উঠতে হয়েছে। তখন ফিলিকা আর লিকলিকে গড়নের একটা ছেলেকে ছাঁদে দেখে। যাদের ভাবখানা দেখে লজ্জায় সরে আসতে চাইছিলো কিন্তু নিজের মধ্য থেকে কি যেনো তাকে আড়ষ্ট করে রেখেছে থেকে যাওয়ার জন্যে। উই’র পুরো শরীর জুড়ে রক্তের খুদার জোয়ার বইতে লাগে তখন, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে কোন ভাবেই ভেতরের রাক্ষুসে ভাবটা যেতে চাচ্ছিলো না। অনেক কষ্টে নিজেকে দমিয়ে বাসায় যেতে উদ্যত হয় উই।

আজকে সারাদিন বাসায় বসে বসে সময় কাটতে চাচ্ছে না উই’র। এমন অবস্থায় ইডেক ছেলেকে কোন এক কাজে বাড়ির পাশে বাগানে যেতে বলেন। বাবার অনুমতি পেয়ে ছেলেও হন হন করে বাগানে ছুটে যাচ্ছে। হুট করে ফিলিকাকে বাগানের মঝখানে দেখে সে থমকে দাঁড়ায়। তার পাশে একটা ছেলেও ছিলো তাকে সে আগেও দেখেছে। ছেলেটির নাম- রিব্বিন। মাত্রই উই খুব স্পষ্ট ভাবে শুনতে ও জানতে পেয়েছে নামটা- 
 ‘রিব্বিন বাবাই আস্তে চাপ দাও আমি খুব ব্যাথা পাচ্ছি’। 

ফিলিকার মুখে একথা শুনে ঘেন্নায় উই এর গাঁ জ্বলে উঠলো তারপরেও তাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ কারবার গুলো দেখে যাচ্ছে। এমন ভাবে সে দেখছে যেনো কোথাও লুকানোর প্রয়োজনবোধ টুকুও করলো না। বেশরমের মতো উই দেখে যাচ্ছে রিব্বিন চুমু খাচ্ছে ফিলিকের। দুজনের স্পর্শে দু ঠোট থেকে শুরু করে গাল অবদি তাদের রক্তের শিরা গুলো ভেসে উঠতে চাইছে। এই অবস্থায় উই নিজেকে আর মানুষ বলে দমিয়ে রাখতে পারছে না। আজ প্রথম সে তার বাবার কোন যুক্তিকে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দিলো।

ইডেক সব সময় ছেলেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছে এবং নিজেদের সে মানুষ বলেও দাবী করেন কিন্তু উই কখনো বাবার সাথে তর্কে যায় নি। তার নিজের কাছে নিজেদেরকে পরজীবীই মনে হয়। তাদেরকে তো সবসময় অন্যের দয়ার উপর বেঁচে থাকতে হয়। অবশ্য এ বেঁচে থাকাকে অন্যের দয়া বললেও ভুল হবে বরং অন্যের সরলতাকে পুঁজি করে তাদেরকে বেঁচে থাকতে হয়। টগবগে তাজা রক্ত দেখে উই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে নি। তড়িঘড়ি করে সে ফিলিকার গায়ে উঠে যায়। নরম দেহে স্তন, গাল আর ঠোটে রক্ত খেয়ে নিজেকে শান্ত করে। রক্ত খেয়ে আস্তে ধীরে শরীর থেকে হেলে দুলে নামছে উই কিন্তু ঠিক তখন ‘আউ’ চিৎকারে সে থেমে যায়। ভয়ে ফিলিকার জামায় লুকায়। তখন শুনতে পায় ফিলিকা কি যেনো বলছে- 
 ‘দেখো তো বাবু আমার গালে ঠোটে আর স্তনে কিসে কামর দিছে’। 

 খুব নিখুঁত ভাবে সবকিছু পরীক্ষা করছে রিব্বিন। স্থানগুলো হালকা ফুলে আছে। ফিলিকাকে সে সান্ত্বনার বানী দেয়, ‘ আমি দেখছি বাবাই’ এই বলে, আদতে সে ফিলিকার স্তনে হাত ঢুকিয়ে পুরো হাতটা বসিয়ে দেয় স্তনে তার হাতের চাপ পড়তেই ফিলিকা একটু উচ্চস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠে। তাতেই খুব ভয় পায় উই। তার ধারণা মেয়েটি কোন ভাবে তাকে জামার ফাঁকে লুকিয়ে থাকতে দেখেছে সে জন্যে তার এই চিৎকার বস্তুত কি ঘটেছে তা যাচাই বাচাই না করেই উই ভয়ে দৌড় দেয়। একদৌড়ে সে বাসায় পৌছায়।

ইডেক ছেলের আতঙ্কিত অবস্থা দেখে তাকে ধমকাতে শুরু করেন। তার পরেও কি ঘটেছে তা বলছে না দেখে তার ছেলের প্রতি সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। ছেলের এখন যে বয়স এই বয়সে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া অসম্ভবের কিছু না। অনেক পিড়াপীড়ির পর ছেলের কাছ থেকে শেষমেশ পুরো কথা বের হয়, উই কোন কিছুই গোপন করেনি বাবার কাছে। সত্যটা শুনার পর ইডেক’কে কিছুক্ষণ চুপ থাকতে দেখা যায়। নীরবতার পর্ব শেষে নিজে নিজেই বলে উঠলো-
ছিঃ ছিঃ 

এই বলে উক্ত স্থান ত্যাগ করে ইডেক। এসময় উই’র চেহারা দেখার মতো ছিলো।

দিনের এই ঘটনার পর থেকে খুবই মন খারাপ ইডেকের। নিজের সন্তানদের মানুষ পরিচয়ে বড় করছে বলে তার খুব গর্ব হতো কিন্তু নিজের মধ্যে আজকে আর গর্বটা ধরে রাখতে পারছে না। মানুষের প্রতি তখনি তার ধিক্কার জন্মালো। কিছুদিন আগেও মানুষ নিজেদের প্রতিটা ব্যাপারের সাথে সাথে জৈবিক চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও খুবই সচেতন ছিলেন। এই জন্যে উত্তম সময় বেঁধে নিতেন রাতের আঁধার কিংবা দিনে বদ্ধরুম। এমতবস্থায় শিকারে বের হলে মানুষের ঠোটে কিবা অন্য কোথাও রক্তের ঝিলিক দেখা দিয়েছে কিনা সেদিকেও ইডেকদের নজর যেতো না। মানুষের চাহিদা গুলো তাদের মতো মিটাতে দেয়া হতো; যখনই মানুষের কাজ পূর্ণ হতো তখন চুপিচুপি তারাও নিজেদের খাবার টুকু চুষে নিতেন মানুষদের শরীর থেকে।

আজকের এই নেক্কার ঘটনা জানার পর থেকে ইডেক নিজেকে আর মানুষ ভাবতে পছন্দ করছে না তার এখন নিজের উপর রাগ হচ্ছে কেন সে নিজেকে ছারপোকা পরিচয় না দিয়ে ওই প্রানী গুলোর নাম দিতো এতোদিন। কেনও বা নিজের ছেলে মেয়ে সবাইকে মানুষ পরিচয় দিয়ে বড় করেছে, তার নিজের প্রতি নিজের ই খুব রাখ হচ্ছে এখন। মানুষের প্রতি তার এক ধরণের শ্রদ্ধাবোধ ছিলো এই ভেবে যে, মানুষ একমাত্র প্রানী যে তাঁর প্রতিটা ব্যাপার খুব নিয়ম মাফিক মেনে চলে। তাদের মধ্যে লজ্জা,শরম, বড়-ছোট, ইজ্জত, নীতিবোধ কতো কিছুই রয়েছে যার সবটুকু অন্য কোন প্রানের মাঝে নেই কিন্তু এতোদিনের আস্থা এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

এতদিন ইডেক নিজের জগতকে অনেক বড় মনে করে এসেছে এখন তার মনে হচ্ছে এই বাসাটা একটা জগত হতে পারে না, এর বাহিরে আসল জগত বিদ্ধমান। যে জগতে ফিলিকার মতো মেয়ে থাকে না, যে মেয়ে যৌবনের স্বাদ মিটানোর জন্যে নিজের পরিবার, সমাজ কিংবা নিজের কথা চিন্তা না করে বাগানে গিয়ে অন্য ছেলেকে নিজের সর্বত্ব দিয়ে দিতে কুষ্টাবোধ করে নি। তার মতো মেয়ে যে জগতে থাকবে সে জগতে কোন ভাবেই থাকা যাবে না। এমন একটা জগত ই তাকে খুঁজে নিতে হবে যে জগতে ফিলিকাদের মতো মেয়দের স্থান নেই। 

ফিলিকার এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটা ছারপোকা পরিবারের লজ্জার অন্ত নেই। এমন লজ্জাকর অবস্থায় থেকে নিজেদেরকে আর ছোট করতে পারবে না ইডেক। সেজন্যেই পরিবার নিয়ে অন্যত্রে পাড়ি জমায় সুন্দর এই শান্তির নীড় ছেড়ে। অথচ এই নীড়ে তুচ্ছ এই ঘটনা ছাড়া কোন কিছুরই কি অভাব ছিলো ইডেকের পরিবারের জন্যে।
 তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইডেকের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে একুশ শতকের কোন প্রগতিশীল মানুষ যদি তার এই ঘটনা শুনতে পায় তখন এই নিয়ে কি পরিমাণ হাসি ঠাট্টা হবে, ব্যাপারটাই আপাদত বিশদ ভাবনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াইছে। এরকম কিছু যদি ঘটেও ছারপোকা পরিবারের কর্তা ইডেক সাহেব কি তখন জানতে পারবে? জানার পর তার প্রতিক্রিয়াও বা কেমন হতে পারে!

বোকাসোকা ইডেক একটা ব্যাপার জানেন না বলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায়। যে জন্যে মানুষের উপর তার আস্থা উঠেছে বস্তুত্ব মানুষ তারচেয়েও নেক্কার কাহিনী দিন দুপুরে রাস্তায় সেরে নেয়। সে ফিলিকাদের বাড়ি ছাড়ার আগেও জানতো না তার জন্যে পৃথিবীর মানুষ গুলো কতো নোংরা অবস্থায় নিজেদের জাহির করার জন্যে তৈরি হয়ে রয়েছে। আরেকটা সত্য কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় এখন, ইডেন এতো কাল যে অঞ্চলে ছিলো তা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো জায়গা। সামনে যেখানে পাড়ি জমাচ্ছেন তা অবস্থা কি হতে পারে একটু কল্পনা করে দেখেন।
নতুন পরিস্থিতি উই বা ইডেকের মনে কী রকম প্রতিক্রিয়া ঘটাতে তা অন্য সবার মতো আমারও জানার খুবই ইচ্ছে কারন আমিও যে ইডেকের মতো একজন। তফাৎ এইটুকু- আমি মানুষ রুপি ছারপোকা। সবকিছু দেখেও লজ্জায় পালিয়ে বাঁচতে চাই কিন্তু কোথাও কোন উপায় নেই। সবখানেই চক্ষুলজ্জা ভুলে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।



সমাপ্তি 
ছোট গল্পঃ আমি উই । লেখকঃ মাহতাব হোসেন 

Wednesday, 5 April 2017

বিচার-ছোট গল্প

ন্ধ্যা থেকে টিপ টিপ গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বৃষ্টি খুবই বিরক্তিকর, কিন্তু তাতে করার কিছু থাকে না। 

এমন বৃষ্টিতে শুকু মিয়ার মন খারাপ থাকে। এখন বসে বসে মনের দুঃখে বিড়ি ফুকছে সে। এসময় তার মনে নানা রকম চিন্তা কাজ করে। এতো ছোট পরিবার তারপরেও খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে, তার যে চাকুরী তা দিয়ে সব কিছু পোষানো যাচ্ছে না। এই যুগে ছয় হাজার টাকা দিয়ে এমনই একটা উপ শহরে চলা শুধু মুখের কথাই নয় দুঃসাধ্য ব্যাপারও বটে।

-শুকু মিয়া...ও শুকু মিয়া, আছো নাকি ভেতরে’। 

নিজের নাম শুনে তার চিন্তায় ছেদ পড়লো। এতো রাতে কার আবার মরার ব্যাতিক হলো। কবর স্থানে কবর খুড়ার চাকুরীতে এই একটা অসুবিধা। রাত নাই দিন কখন যে মানুষ মরে। দিনে কে মরলো না মরলো তা নিয়ে তার মাথা ব্যাথা নেই। তখন মাথা ব্যাথা থাকলে থাকবে কাসেম মিয়ার। দিনে যা ঘটে তা কাসেমের দেখার বিষয়। এতো বিশাল কবর স্থানে তারা মাত্র দুজন মানুষ বারো ঘন্টা করে ডিউটি দেয়। শুকু মিয়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে দুটা বেজে বিশ মিনিট। তার টিনের দেয়ালে টাঙ্গানো ছোট ঘড়িটা সব সময় কাজ করে না। মাঝে মাঝে সকাল বেলায়ও দেখায় ঘড়িতে রাত তিনটা। তারপরেও কেনো যেনো মনে হচ্ছে আজকে ঘড়ি সময়টা ঠিক দেখাচ্ছে। 

গুঁড়ি বৃষ্টিতে কবর স্থানের এই ছোট কামরা থেকে বের হতে মন চায় না শুকু মিয়ার। তারপরেও ঠেকায় পড়ে বের হতে হচ্ছে তাকে। নিজের মধ্যে বিরক্তি চেপে ছোট লাইটটা নিয়ে গেটের কাছে যায়। গেটের সামনে চার-পাঁচ জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবার শরীর হালকা ভেজা আর চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। 

শুকু মিয়া কাছে আসতেই তাদের মধ্যে একজন বলে উঠে, ‘তারাতারি গেট খুলো মিয়া, কথা আছে তোমার সাথে’। 

গেট খুলতে না খুলতেই গেটের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মধ্যে একজন তরিঘরি করে গেটের ভেতরে ঢুকে পড়লো। লোকটির নাম লোকমান। যদিও এই লোকটার নাম জানতে শুকু মিয়ার একমাস লেগেছিল। সে নিজেও জানে না লোকটার নাম সে জানতে পারবে। তার তো জানার কোন ইচ্ছেও ছিলো না। যাইহোক সে আবার অন্য গল্প। না জানলেও হবে। 

‘চলো, সাইডে চলো। তোমার সাথে কথা আছে’ 

এই বলে লোকমান শুকু মিয়াকে সাইডে নিয়ে গেলো। তারপর বলতে শুরু করলো কথা- 
‘তোমাকে আমাদের জন্যে একটা উপকার করতে হবে। এই জন্যে অবশ্য আমরা তোমাকে প্রাপ্য সম্মানী দিবো’। 

‘কি উপকার তা তো আগে শুনতে হবে। না শুনলে কিভাবে সাহায্য করবো’-মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনার পর শুকু মিয়া বললো। 

‘সবই বলবো, তার আগে বলে রাখি রাতের এই ব্যাপার গুলো যাতে দুনিয়ার কেউ না জানে। তোমার বৌ কিংবা তোমার সাথে ডিউটি করা কাসেমও না’। 

‘না কেউই জানবে না’ 

কথাটা বললেও মনে মনে শুকু মিয়া খুবই আগ্রহী হয়ে আছে পুরো ঘটনা জানার জন্যে।

‘আচ্ছা শুনো, আমাদের সাথে একটা লাশ আছে, চটে করে প্যাচানো। তোমার কাজ হচ্ছে লাশটাকে কৈই কবর দিবো তা দেখিয়ে দেয়া। কবর খোডা আর দাফনের কাজ সব কিছু আমরাই দেখবো। লাশের গোসলও করানো লাগবে না। লাশ কৈই থেকে আসলো, লাশের কি হলো, এসব ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করা যাবে না। এই জন্যে আমরা তোমাকে অনেক টাকা দিবো’। 

কথা গুলো শুনে তার গায়ের লোম শিহরিত হয়ে উঠেছে। কোনো মানুষকে কবর দিতে গিয়েও কখনো তার এমন হয় নি। এমুহূর্তে কথা বলতেও শুকু মিয়ার তোতলামি হচ্ছে-
‘আ আ ...আমি... আ... মি... করবো সাহায্য? এ...তো মেলা পাপের কাম’। 

‘শুনো মিয়া এই পাপের সব বোঝা আমাদের, গুনাহ যা হবে তার দায় সব আমরা নিবো, তুমি শুধু আমাদের সাহায্য করবে। তাতে করে তুমি কিছু টাকা পাবে আর লাশটা পবিত্র স্থানে ঘুমাতে পারবে’। 

লোকমানের কথায় আশ্বস্ত হয় শুকু মিয়া। লোকটার কথা তার মনে ধরেছে। এ কথাও সত্য, সে যদি তাদের সাহায্য না করে তাহলে লোকগুলো লাশটাকে নদীতেও ফেলে দিতে পারে। তার উপর নিজের যে কিছু টাকা আসার, সেগুলোও হাত ছাড়া হয়ে যাবে। 

‘আপনারা আমাকে কতো দিবেন, বিশ হাজার দিতে পারবেন তো’। নিজের লোভকে দমাতে না পেরে একদমে কথা গুলো বলে ফেললো শুকু মিয়া। কথাটা শুনে লোকমান হাসলো। তাচ্ছিল্য ভরা হাসি। বিশ নয় তোমাকে পঁচিশ হাজার ই দিবো, কিন্তু শর্ত আছে। কেউ যাতে ব্যাপারটা না জানে। এমন ভাবে কাজটা করতে হবে সকালে যাতে কাসেমও টের না পায় রাতে এখানে কি হয়েছিলো। কেউ টের পেলে তোমার পরিবারের কি হবে তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না’। 


মাথা নাড়িয়ে লোকটার কথায় সায় দিলো শুকু মিয়া। এই মুহূর্তে শুকুর চেহারায় অসহায়্যত্ব ফুটে উঠেছে। মনে মনে এই জন্যে নিজেকে দুষলেন। 


‘শালা....এই জন্যেই অন্যের সাহায্যে জড়াতে নেই। সাহায্যের জন্যে কিছু টাকা দিবে তার জন্যে আবার নিরবে হুমকিও দিচ্ছে। মগের মুল্লুক পাইছে’। কথাগুলো নিরবেই নিজের মনে নিজেকে বলে গেলো শুকু। 


‘নেও তোমার সম্মানীটা রাখো’ কথাটা শুনে নিজের হুশ ফিরে পেলো। 

এতো বড় টাকার ব্যান্ডেল। এর আগে শুকু একসাথে কখনো দেখে নাই। টাকার ব্যান্ডেলটা নিয়ে কোমরে গিঁট দিয়ে রেখে দিলো। 

লোকমানের ইশারায় বাকি সবাই লাশটা ধরাধরি করে গেটে ঢুকালো। শুকু মিয়া তাদেরকে পথ দেখাচ্ছে, কোথায় লাশটা নিয়ে যেতে হবে। 

কবরের শেষ প্রান্তে সবাই লাশটা নিয়ে জড়ো হলো। সাধারণত কবরের এই সাইডে কেউ ভুলেও আসে না। কাসেম বা শুকুও না। এই দিকে সাপ জোকের বিষণ উৎপাত। অবশ্য লুকিয়ে কবর দেয়ার জন্যে জায়গাটা সবচেয়ে উত্তম। প্রায় আধ ঘন্টা কাজ করার পর কবর খোড়া আর দাফন কাজ শেষ হলো। সব কাজ লোকগুলোই করলো। শুকু মিয়া এতে ব্যাপক অবাক হলো। মনে মনে মানুষ গুলোকে বেকুব বলতেও ভুলে নাই। এতো গুলো টাকা দিলো তারপরেও তাকে দিয়ে এক টুকরো মাটিও কাটতে দেয় নাই। এতে অবশ্য শুকু খুবই খুশী। লাশের যে কোন কাজ করলে সে গোসল করে। এটা তার এক প্রকার বাতিক। এইদিক থেকে লোকগুলো তাকে রাতে গোসল থেকে মুক্তি দিলো। 

কবর দেয়া শেষে কবরটা এমন ভাবে সাজানো হয়েছে যাতে কারো বুঝার সাধ্য না হয় এটা নতুন কবর। অবশ্য কিভাবে সাজালে এমন দেখাবে তার সবকিছু বাতলিয়ে দিয়েছে শুকু মিয়া। লোকগুলো শুধু তার কাছে এই একটা ব্যাপারই জানতে চেয়েছে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এখনো হচ্ছে। বৃষ্টি হওয়াতে এই একটা সুবিধে- কবর সাজাতে আরো সহজ হয়েছে। 

কবর দেয়া শেষে লোকগুলো চলে যায়। যাওয়ার আগে সব কিছু লাইট দিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করে নেয় শেষ বারের মতো। কোন প্রমাণ না রেখেই সবাই বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে কেউ এখানে হাত মুখও ধুলো না। হাত-পায়ে কাঁদা মাটি নিয়েই রওনা দিলো। যাওয়ার আগে শুকু মিয়াকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতেও ভুলে নাই কেউ। 

এখন সকাল পাঁচটা বাজে। তারপরেও তার চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। টাকা যে তার ঘুম হানির কারন তা শুকু মিয়া জানে না। নিজের মনে কতো স্বপ্ন। গত আটচল্লিশটা বছর পার করেও সে কখনো এক মুঠে এতো টাকা দেখে নি। তার বয়স যখন সতেরো, তখন যে পাশের বাড়ির চুমকিকে নিয়ে এই শহরে পালিয়ে বিয়ে করে নিয়ে আসে; তারপর আর কোথাও যাওয়া হয় নি। এই প্রথম তার ইচ্ছে, নিজের বৌ আর ছাব্বিশ বছরের ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার। বিয়ের পাঁচ বছর পর যে তার পুত্র সন্তান হয়েছে তারপর থেকেও বৌ বা সন্তানকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে পারে নাই। পরিবারের ঘানী টানতে টানতে কখন যে বয়সটা শেষ হয়ে গেলো তা বুঝার মতো অবস্থাও হয় নি শুকু মিয়ার। এক সময় শুকুও তো তার একমাত্র সন্তান রাসেল’র মতো টগবগে যুকব ছিলো। তখন কতোই না ইচ্ছে ছিলো বৌ আর সন্তানকে নিয়ে ঘুরার, কিন্তু হায় কপাল। এখন সবই অতীত। সবই আবেগ। 


‘এই সকাল সকাল কে আবার গেট পিটা পিটি শুধু করলো। সবে মাত্র চোখে একটু ঘুম লেগে এসেছে, আজকে বুঝি কেউ একটু ঘুমাতেও দিবে না’। 

ঘড়িতে এখন সকাল সাতটা। তারমানে কাসেম আসে নি এখনো, এটা নিশ্চিত। কাসেম কখনো আটটার আগে আসে না। শুকু মিয়া ঘরের কোনে লুকিয়ে রাখা টাকা গুলো আবার কোমরে গুজে নিলো। তারপর গেটের দিকে রওনা দিলো চোখ কচলাতে কচলাতে। 


সাতসকালে গেটে নিজের বৌকে দেখে ভূত দেখার মতো ভয় পেয়েছে শুকু। চুমকি তো কোন বিপদ ছাড়া এখানে আসে না। এমনিতেই বেচারী কবরকে খুব ভয় পায়। তার মানে পরিবারের কোন বিপদ, এতো সকালে আসছে মানে ধরে নেয়া যায় বড় ধরনের কোন বিপদ। মনে মনে আল্লাহ্‌কে ডাকে শুকু- ‘আল্লাহ্‌ মাবুদ আমাদেরকে বিপদ থেকে রক্ষা করো’। কি হয়েছে তা জানতে চাওয়ার আগেই বৌ কাঁদতে কাঁদতে বলে- 


‘ও রাসেলের বাপ। রাসেল তো গত বিকালে বের হইছে এখনো বাসায় ফেরে নি। রাতে আমি তার জন্যে অনেকক্ষন অপেক্ষা করে পরে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমানোর আগে দরজা আড়াআড়ি করে রেখে দিয়েছি। সকাল ঘুম থেকে উঠে দেখি দরজা আগের মতোই আছে, তার খাটের দিকে তাকিয়ে দেখি সে নাই’। চুপচাপ কথা গুলো শুনার পর শুকু মিয়ার বলার মতো কিছু রইলো না।  


‘তুই বাড়ি, যা আমি দেখছি’ বলে গেট লাগিয়ে ভেতরে চলে আসে শুকু মিয়া। কাসেম আশা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তারপর ছেলের খোঁজে বের হবে।  

আজ থেকে একমাস অবদি ছেলের খোঁজ করে গেছে শুকু। আখের কোন ফল হয় নি। ক্ষত মনে ব্যাপারটা প্রথম দিকে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারে নি। সময়ের সাথে সাথে মনের ঘাঁ শুকিয়ে যায়। আস্তে আস্তে সবকিছু স্বাভাবিকও হয়ে যায়। তারপর, তারপর শুকুর মনে আবার ঘাঁ শুরু হয়। যে ঘাঁ কখনো শুকাবার না।


বিকালে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে শুকু। সারারাত কাজ শেষে দিনে শুকু মিয়ার ঘুম ছাড়া কোন কাজ থাকে না। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুমায় সে। ঘুম থেকে উঠে গোসল, খাওয়া দাওয়া ছাড়াও নিজের বৌকে টুকটাক গৃহের কাজে সাহায্য করে, আগে ছেলে থাকতে ছেলে এসব করতো। তারপর বিকেলে বাজারে আসে। সন্ধ্যা পর্যন্ত আড্ডা দেয়। আড্ডা শেষে কর্মস্থলে ফিরে যায়। নিয়ম মাফিক আজকেও তাই হচ্ছে। 

হুট করে একটা ছোট ছেলে এসে বলে গেলো ‘কাকু’ তাকে তলব করছে এক্ষুনি দোকানে যাওয়ার জন্যে। 

হামিদ সাহেব- হলেন অত্র এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তি। আগে সরকারী চাকুরী করতেন এখন বাজারে বড় রঙের দোকান উনার। এখানকার সবাই উনাকে কাকু নামেই ডাকেন। শুকু মিয়ার চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের বড় হামিদ সাহেব। তার সাথে শুকু মিয়ার খুবই ভাব। শুকু মিয়া তার কাছে মাঝে মাঝে পরামর্শের জন্যেও যায়। তার ছেলের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অন্য সবার মতো হামিদ সাহেবও তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে। 

শুকু দোকানে যাওয়ার সাথে সাথে হামিদ সাহেব পত্রিকা থেকে নিজে চোখ সরিয়ে তাকে একটা ছবি দেখতে দেয়। লেখা পড়া জানে না শুকু। পত্রিকায় ছবি দেখে তার বুকে ধুক ধুক শুরু হয়ে যায়। পত্রিকায় থাকা পাঁচ জন মানুষের মধ্যে একজন তার পরিচিত। লোকটির সাথে তার দেখা হয় একমাস আগে কবর স্থানে। রাতের অন্ধকারে যার সাথে সাহায্য করা নিয়ে এতো কথা তাকে তো কখনো ভুলার নয়। 

শুকু মিয়া ছবির যে মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে সেদিকে আঙুল দেখিয়ে হামিদ সাহেব বলেন, ‘তোমার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বিকেলে এই ছেলেকে আমি দেখেছি। রাসেলের সাথে কি নিয়ে তার কথা কাটাকাটি হয়। এরপর হাতাহাতি। আমার দোকানের ছেলেরা গিয়ে তাদেরকে ছাড়িয়ে দেয়। নাহলে তখন অনেক ঝামেলা হতো। সম্ভবত এই ছেলের নাম ‘লোকমান’। পত্রিকায় তো তাই লিখেছে। তোমাকে আমি ডেকেছি ছেলেটিকে চেনো কিনা তা জানার জন্যে। 

‘না’ শুকু মিয়া মুখ দিয়ে স্রেফ জানিয়ে দেয়। 

‘পত্রিকায় কলাম পড়ে ছেলেটিকে খুব বেশী অসুবিধারই মনে হচ্ছে। ও খুব জঘন্য সব কাজের সাথে জড়িত। যাইহোক এ জন্যেই তোমাকে ডেকেছি। আচ্ছা তুমি আড্ডা দিতেছিলে যাও আড্ডা দাও পড়ে আবার কথা হবে, এই বলে ভদ্রলোক আবার পত্রিকা মগ্নতা নিয়ে পড়া শুরু করলেন। 

শুকু মিয়া রাস্তায় হাটছে। দোকান থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার মনে নানা রকম প্রশ্নরা উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। তার মনে বার বার ই একই কথা আসছে। পত্রিকায় দেখা লোকমান ছেলেটি সেই তাহলে তার ছেলে রাসেল কে... এই টুকু ভাবার পর আর ভাবতে পারছে না শুকু মিয়া। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। খুবই পানির তৃষ্ণা পাচ্ছে। তার চোখে মুখে অন্ধকার ঠেকছে সব কিছু। নিজের ছেলেকে নিজেই... এই টুকু ভেবেই আর নিতে পারছে না। হাটতে হাটতে শুকু মিয়া রাস্তায় পড়ে যায়। 

ইতি

ছোট গল্পঃ বিচার
 লেখকঃ মাহতাব হোসেন 

Friday, 10 March 2017

রাজকন্যার হিরোর গল্প

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। হ্যারিকেনের আলোয় পুরো ঘর জুড়ে অলৌকিক আভা। যেনো রূপ কথার কোন এক রাজ্যে শান্তির এক নীড়। যে নীড়ে বৃষ্টি আশীর্বাদ হিসেবে নেমে এসেছে।

টিন আর কাঠে তৈরি ঘরে লোহার শিক দিয়ে বানানো জানালা। ঘরের সম্মুখ জানালার পাশে বসে আছে রাত্রি। হ্যারিকেনের আলোও তাকে অনেক মায়াবী দেখাচ্ছে। যেনো পারস্য দেশের কোন এক ড্রামা সিরিয়ালের নাকিয়া।

টিনের চালে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি স্রষ্টার নেয়ামত। নেয়ামতে অদ্ভুত সৌন্দর্য। বৃষ্টিতে চারদিকে রিমঝিম শব্দ খেলে। টিনের চালে টুপ টুপ শব্দ। মায়াবী মেয়েটা যেনো কোন এক মায়াবী রাজ্যে হারাতে চায়। কিন্তু কোথাও জেনো তার সব কিছু থেমে রয়েছে।

রাত্রির দৃষ্টি সামনে বারান্দা পেরিয়ে বাড়ির মাটির উঠোনে। তাদের বারান্দাটা অনেক সুন্দর। মায়ের হাতে বানানো মাটি লেপে তৈরি করা বারান্দা। আগে তারা প্রায় রাত্রি বেলায় এই বারান্দায় পাটি পেতে গল্প করতো। বাবা ছিলো তাদের গল্পের মূল আর্কষণ। বাবা কতো রকম গল্পই না শুনাতো তাদের। বাবার গল্প বলার ভঙ্গি দেখে রাত্রির মনে রাত্রি বেলায় কতোই না ঈর্ষা হতো। মনে মনে তখন কতোই গল্প বানাতো। বাবাকে শুনাবে বলে কতো রকম ভাবেই না গল্প বানাতো। সবই অতীত, সবই সোনালী দিন। আচ্ছা, সুখের সীমানা অনেক ছোট হয় নাকি সময়ের স্বল্পতা ব্যক্তি নিজেই নির্ধারণ করেন?

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে। ছোট এই নীড়ে সব কিছুই আছে। আছে সুখ, আছে ভালোবাসা, এখানে মায়ার বাঁধন খুবই অটুট। অল্পতেই সবাই একে অন্যের জন্যে মরীয়া হয়ে পড়ে। তারপরেও এই সুখের নীড়ে বৃষ্টি ভেজা রাতে কিছু একটা কমতি খেলে। রাত্রির চোখে তাকালে সে কমতি কেউ উপেক্ষা করতে পারবে না।

হ্যারিকেনের আলো রাত্রির কামরা পেরিয়ে উঠোনে ঠেকেছে। হ্যারিকেনের রঙ্গিন আলোয় উঠনে পড়তে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা গুলোকে কতোই না সুন্দর দেখাচ্ছে। বৃষ্টির ফোটায় পলি জমা মাটি গুলোও কতো আগেই ক্ষত ধরেছে। প্রতিটা বৃষ্টির ফোঁটা মাটির বন্ধন ছিঁড়ে ভিতরে ক্ষত তৈরি করেছে। বের হচ্ছে মাটি থেকে গাড় রঙের বেদনা। বেদনা গুলো মাটির সাথে পানির স্রোতে দূরে কোথাও গিয়ে ঠেকছে। এভাবে, নতুন ভাবে নতুন স্থানে নতুন করে গড়ে উঠবে মাটিদের আরেক বসতি।

এই অপরূপ বৃষ্টিও আজ রাত্রির চোখে সৌন্দর্য দেখাতে ব্যর্থ। এই রাত্রিই এককালে কতো করে চাইতো বৃষ্টি মাখা সময়ে নিজের হিরোকে নিয়ে জানালার পাশে বসে গল্প করবে। যে গল্পে বাদ যেতো না কিছুই। মাঝে মাঝে তারা চা খেতো আর বৃষ্টির পড়ার এই ব্যাপার স্যাপার নিয়ে নিখুঁত আলাপ করতো।

বৃষ্টিরা কেনো আসে, কেনো যায়। বৃষ্টি আসলে লোকালয়ের সুবিধা কি বা অসুবিধা কোথায়। কোন কিছুই বাধ যেতো না আড্ডায়। অথচ আজ অবধি বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু এ বৃষ্টি রাত্রির মনে তাড়না কাজ করাতে সক্ষম হচ্ছে না। বৃষ্টি হলে সে এখনও জানালায় পাশে বসে। এটা ভালোবাসার খাতিরে না, অভ্যেসের দায় থেকে।

কোন এক ঝড়ের রাতে যে মানুষটির গল্প করার কথা ছিলো তা না করে বরং রাত্রিকে বিদেয় জানিয়ে চলে যায়। চলে যায় না ফেরার দেশে। রাত্রি কোন ভাবেই তার হিরোকে ভুলতে পারছে না। কি রকম ব্যথাতুর হৃদয় হলে একটা কোমল মন প্রকৃতির নিয়মকে মেনে নিতে অপরাগত জানায়।

গ্রামের অন্য সব মেয়ের মতোই বেড়ে উঠতে পারতো রাত্রি। কিন্তু উদার আর আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন বাবা করিম উদ্দিন কোন ভাবেই চায় নি তার মেয়ে অন্য সব গ্রামের মেয়ের মতো বেড়ে উঠুক।

প্রকৃতি যেখানে মানুষকে উদার হয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে সেখানে গ্রামের মানুষদের মনে ভূত বাসা করে রেখেছে। তারা প্রকৃতির এই কৃজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে নিজেদের মতো একটা সর্কীণ্ণ সমাজ গড়ে তুলেছে। যে সমাজে কোন কিছুর ই ঠিক নেই। ডর, ভয়, কুসস্কার, ভণ্ডামি, ধর্মীও গোঁড়ামি এই রকম ছেলে-খেলা ব্যাপার গুলো সমাজের মূল মন্ত্র হিসেবে ঠাই করে নিয়েছে।

করিম উদ্দিন সমাজের এমন ব্যাপার গুলোর উর্ধে। নিজের সন্ত্রান বা স্ত্রীকে এমন ব্যাপার গুলো থেকে দূরে রেখেছে। এই নিয়ে সমাজে তাকে নিয়ে কম কানাঘুসা হয় নি। অনেকে তো আড়ালে তাকে পাগল বলেও তিরস্কার করতো।

ঝড়ের রাতে রাত্রির বাবার মৃত্যুকে সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তিরা স্বাভাবিক ভাবে দেখে নি। তাদের মতে আল্লাহ্‌’র গযব পড়েছে তার উপর। কানাখোসা কথাগুলো রাত্রি কিংবা তার মায়ের কানেও এসেছে। মানুষের এমন আচরণে তারা মোটেও দুঃখ পায় নি। যারা এমন অসুস্থ মন-মানুষিকতা নিয়ে ঘুরছে তাদের প্রতি রাত্রির মনে চরম সমবেদনা রয়েছে।

করিমের মেয়ে তার প্রায় সব কিছুই পেয়েছে। কথা বার্থা, চেহানা, আচার ব্যবহার। এই নিয়ে আল্লাহর কাছে রাত্রি খুবই কৃতজ্ঞ। মাঝে রাতে প্রার্থনা শেষে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞা প্রকাশ করে। তার নিজের মাঝে মাঝে মনে হয়, “বাবা বুঝি নিজে চলে গিয়ে তাকে রেখে গেছে বাবার প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে”।

আজকের এই বৃষ্টিভেজা পরিবেশ তার মনে কোন উচ্চাশা জাগাতে পারে নি। রাত্রির মন এখনও ব্যথাতুর হয়ে আছে। মনের গহীনে কোথাও যেন বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টির উৎস কোথায়, তা কারো জানা না থাকলেও বৃষ্টির কারনটা যে তার হিরো এটা না বুঝার মত ব্যক্তি একজনও নেই স্রষ্টার এই জগতে।


মাহতাব হোসেন
১১ মার্চ, ২০১৭
রাত ১টা ৫০ মিনিট।


Wednesday, 1 March 2017

মনের গহীনে স্পন্দন

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ভোর রাত থেকেই শুরু এই আহাজারি। তারপরেও আলসামী করে বারান্দায় আসতে মন চাচ্ছিল না। মদ খাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই নাকি মানুষের ছাপ শুরু হয় প্রস্রাব করার জন্যে। হালার প্রস্রাব, আর সময় পেলো না ছাপ দেয়ার। একটু ঝিম মেরে বসে থাকতেও দিবে না। এই দিকে মন উদগ্রীব হয়ে আছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি দেখার
জন্যে। অন্য কোন সময় হলে এতো আলসামি পেয়ে বসতো না। আজকের ব্যাপারটা একটু অন্য রকম। অনেকদিন পর হাং আউট সাথে একটু ঝিমুনি। ভাবতেই একটু শান্তি আসে মনে। শহুরে এই যান্তিক জীবনে সবসময় ঝিমুনি নেয়ার ব্যবস্থাও বা কই থাকে। প্রতিদিন গদবাধা লাইফ। সকাল সকাল ঘুমাও। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠ। বাসের জন্যে লাইন ধরো। অফিসে কাষ্টমারদের সাথে গ্যাঁজ গ্যাঁজ করা। উও! কি দুর্বিষহ লাইফ। ভাবতেই জীবনের প্রতি এক ধরণের তিক্ততা আসে। এই তিক্ততা থেকে মুক্তি পেতে মাঝে মাঝে এই একটু আক্টু ঘোলা পানি জীবনটায় একটু জীবন দান করে। মানুষটা এমন ই। প্রতিদিন হাংগ খাওয়ার পর এই একই কথা ভাবে কিন্তু সকাল হলে টেন পায়, গত কিছুদিন যাবত সে রীতিমতোই মাল খেয়ে আসছে।
আর সইতে না পেরে অবশেষে জাকির প্রায় বাধ্য হয়ে উঠে পড়লো। বাথরুমে গিয়ে হাই কমেটে তেলাপোকা চোখে পড়লো। শালার তেলাপোকাটাটা শেষ পর্যন্ত তার জিপারের ভেতরে থাকা বস্তুতা দেখে নিলো। জিপারটা আটকাতে আটকাতে তেলোপোকার গুষ্টি সহ খিস্তী মেরে উৎরিয়ে নিলো।
ব্যাপারটা আর সয্য করা যাচ্ছে না। এর একটা বিহিত চাই। আজকে তেলাপোকা শালাকে প্রস্রাব দিয়েই কমেটে ডুবিয়ে মারতে হবে। জিপার খুলতে যাবে। তখন ই দেখে কমেটে উপর নীচ সবখানেই তেলাপোকা আর তেলাপোকা। চোখ একটু ভালো করে ডলে নিলো সে। নিজেকে প্রশ্ন করলো জাকির, হাং কি বেশী হলো নাকি? না এমন তো হওয়ার কথা না। মাল খাওয়ার ব্যাপারে নিজের উপর তো তার যথেষ্ট আস্থা আছে। ওই যে কিছুদিন আগেও তো সুহৃদের সাথে বাজি দরে একটা ফরেন মাল একাই সাবাড় করে দিলো, এটা দেখে বেচারা সুহৃদের মুখের অভিব্যাক্তি দেখার মতো ছিলো। বেচারা বেতন পেয়ে একটা মাল নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে উঠলো দু বন্ধু মিলে রাতে জম্পেশ মাল খাবে বলে কিন্তু বাজি দরে তো পুরাই ধরা খেলো। সে জানতো জাকিল মাল ভালো খায় তাই বলে কি পুরো এক বোতল একা খাবে, এটা ঘুরনাক্ষরেও কল্পনায় আসে নি সুহৃদের। মন মরে বেচারা কষ্ট পেলো। বাধ্য হয়ে সারা রাত একটু শাকসবজি খেয়ে কাটিয়ে দিলো। মাঝে মাঝে একটু খক খক কাশি ছাড়া সে রাতে তার কিছুই বলার ছিলো না।
শালার তেলাপোকার দল। কই থেকে আইলো এই সাতসকালে কমেটে মাতব্বরি করতে। তাঁদের আচরন মোটেও তার কাছে সুবিধার মনে হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জিপারটা টানিয়ে গিজ গিজ করতে বাথরুম থেকে বের হলো।
দূর শালা যে কাজে বিছানা থেকে উঠ কাজটা তো সারাই হলো না। শালার প্রস্রাব ও কম নয়। সুযোগ বুঝে মজা চোদায়। যেই না জিমুনি আসলো তখন ই ছাপ দিতে গেলো। চোদনা এখন নিজেই তেলাপোকা দেখে চোদ গেয়ে গেলো। কই এখন ছাপ দিতে পারে না, তাহলে তেলাপোকা গুলোকে তাড়িয়েও হলেও একটু টাঙ্কি খালি করা যেতো।
বারান্ধায় বসে সিগারেট খাচ্ছে খুব ফিল নিয়ে। আহা জীবন অনেক সুন্দর। আহা জীবন। একটু বেশী হাং খেলে জাকিরের মুখ থেকে সব সময় এই শব্দ গুলোই বের হয়। এতক্ষণ তেলাপোকা আর প্রস্রাবকে খিস্তী কাটলেও এখন মনে হছে তখন না উঠলে বৃষ্টি ভেজা এই সুন্দর সকালটা খুবই মিস করতো।
কুয়াশা মাখা মিষ্টি সকালটা খুবই মোহিত করেছে। নিজেকে আবেগে আপ্লূত করে তুলছে নিজের মধ্যে বাস করা আরেক আমি। তখন নিজে মধ্যে থাকা আরেক আমি বেসুরা গলায় আপনা আপনিতে গেয়ে উঠলো জন ডেনভারের সেই বিখ্যাত গানটা। 'ইউ ফিল আপ মাই সেন্সেস' টানা তিন বার গেয়ে একটু চুপ মেরে গেলো। সে একটুও কল্পনা করতে পারছে না, আসলে সে কতোটা হাংগ খেলো।  
গত এক সাপ্তাহ হলো স্পন্দনের সাথে তার ব্রেক আপ হইছে। স্পন্দন যাওয়ার পর থেকে তাঁর মনের স্পন্দন বেড়ে গেছে, খুবই বেড়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা একটুও মেনে নিচ্ছে না সে বরং সে নিজেকে সবসময় স্বাভাবিক ভেবে যাচ্ছে আর প্রতিরাতে একটা করে ভ্যাট ৬৯ হজম করার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রতিরাতের মতো আজকেও একটু বেশী হাংগ হয়ে গেছে। 'ইউ ফিল আপ মাই সেন্সেস' এই লাইনটা আবার গাইলো। যে কেউ শুনলে ভাববে এই শালা গানও শ্লো মোশনে গায়। তাঁর মুখে গানটা প্রায় এই রকম ই শুনা গেছে, 'ইইইউউউ...উ ফি...ল আআআপ মামই সেসেন্সেসসস'। 
লাইনটা শেষ হতেই বারান্ধায় থাকা চেয়ার থেকে থুপ করে পড়ে গেলো জাকিব। শব্দটা শুনালো বড় কোন দানবের শেষ পরিণতির মতো। মনে হলো দিশেহারা হয়ে দানবটা তাঁর রাজ্য থেকে ক্ষমতা হারালো। যেনো থুপ করে নীচে পড়ে তলিয়ে গেলো। তাঁর অবস্থা এমনই ছিলো যে, মনে হচ্ছে একটা দানব মাত্র কই থেকে উড়ে এসে বারান্দার ফ্লোরে পড়লো। তাঁরপর বনের কোনো না জানা জানোয়ারের মতো গোংগিয়ে যাচ্ছে অনবরত। ঘুমের মধ্যে যে মানুষ এখন গহীন অরণ্যে ডুব মেরেছে, তা কি সকালে ঘুম থেকে উঠে বুজিতে পারবে মানুষটা। এমন একটা মানুষকে ঘুমের মধ্যে কতোটা অসহায় দেখাচ্ছে তা কি কখনো দেখতে বা বুঝতে পারবে স্পন্দন। মানুষটার আজকের এই অবস্থার জন্যে পরোক্ষভাবে হলেও স্পন্দনের প্রভাব রয়েছে এ কথা তো জাকির বা স্পন্দন কেউ ই জানতে পারবে না। তারপরেও তো চলতে হবে, জীবনটা যে ভাবে চলে। অন্য সবার মতো তাঁদেরকেও মাথা পেতে বাস্তব মেনে নিতে হবে। না মেনেও বা উপায় আছে! কেউই তো বাস্তবতার উদ্ধে না।

Wednesday, 13 April 2016

একটি বহু পুরানো স্মৃতি (ছোট গল্প)

প্রকৃতি আসলে নিজ ঢং এ ভাগ্যের খেইলটা দেখায়। না হলে মানুষের জীবনে এতো ভাগ্য সন্ধানী গপ্পো কিভাবে ঘটে যায় তাও আবার গল্প গুলো ইন্টাররিলেটেড। ভাগ্য জিনিষটা আসলে টাকার এপিট ওপিটের মতো। কখনো দু পিট এক সাথে দেখা দেয় না। এক পিঠ দেখতে গেলে অন্যপিঠ হারিয়ে যায়।
এই তো ঘটনাটা বহুকাল আগের না। ইন্টার পাশ করে সবাই ভার্সিটি'র খোঁজে নেমেছে। কে কোথায় ভর্তি হবে সে চিন্তায় নাওয়া খাওয়া নেই নিজেদের মধ্যে। কেউ কেউ তো ভর্তি পরীক্ষার আগের সময় গুলোতে ঘর থেকে বের হতেই চায় না। টানা কয়েক মাস বইপত্র গলদকরন করে পরীক্ষাগারে গিয়ে বমি করে আসে। বমি থেকে বাছাইকৃত উত্তম বমিওয়ালা ই সুযোগ পেয়ে যায় পরবর্তী লক্ষ্যস্থানে পড়ার। সবাই যখন পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত মতি তখন টাকার খোঁজে নামে রাস্তায়। এসে পড়ে সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায়। ঢাকার রাস্তায় রাতেও এতো আলো তারপরেও রাত-দিন গুলো অন্ধকারে ঢেকে ছিলো মতির । মাঝেমাঝে রাজ পথে বর্ষণ না দেখলেও নিজের অন্তজ্বালে কম বেশ স্রোত ভয়ে ছিলো তার। এরই মধ্যে রৌদুরের দেখা মিলে একদিন। জুটে যায় চাকুরিটা।
বেতন বেশী না হলেও দু'মাস যেতে না যেতে চাকুরী পথে আকা বাকা গলি গুলোয় চলতে শিখে নিয়েছে। আকা বাকা গলি দিয়ে হাটতে গিয়ে দেখা গেলো মতির বেতনের তিন গুন টাকা আসতে শুরু করলো মূল টাকা ছাড়াও। তখন প্রথম মাথায় আসে হাতে বড় সুযোগ আছে পরবর্তী কালের জন্যে কিছু করার। সে থেকেই সুযোগি হয়ে উঠে। খোঁজে থাকে চুরি করার। তখন থেকে কাগজে ছাপার সব কিছুর উপর ভাগ ভসাতে শুরু করে মতি। ছাপা খানা থেকে তার বেশী নজর ছিলো কাগজের স্টক আইটেমের উপর। ঝড়-বৃষ্টি, চুরি, নিম্নমানের কাগজ উৎপাদন, নানা রকম অজুহাত দেখিয়ে প্রতিনিয়ত কাগজের বড় বড় চালান অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া হতো নিমিষেই। সরকারী চাকুরী বলে কথা। পোষ্টটা যদিও গরিবী ছিলো; চুরি বিদ্যা জানা না থাকলে মতির মতো তৃতীয় শ্রেনীর কর্মকর্তাদের সাথে প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে তেমন অমিল থাকতো না, বরং এখন কিছু ক্ষেত্রে তারা মতির চেয়ে একটু পিছিয়ে আছে; এমনকি সামাজিক ভাবে না হলেও আর্থিকভাবে ও মতি তার বসদের চেয়ে বেশী সচ্ছল এখন। চালানের টাকা বেশীর ভাগ তার পকেটে গেলেও মাঝে মাঝে বড় কর্তাদেরকে ভিক্ষা দেয়া লাগে। যাকাত না নিলে তাদেরও ভাত হজম হতে চাও না। কারো হজমক্রিয়া খারাপ হলে পরিবেশ খারাপ হতে পারে যে কোন সময়ক্ষনে। তাই নিজ থেকেই পরিবেশ দূষণ মুক্ত রাখার জন্যে মাঝে মধ্যে বড় কর্তাদের একটা খাম ধরিয়ে দিলে তারাও খুশি থাকে। তাদের হাসি দেখে মনে হয় তাদের জন্মই হয়েছে টাকা দেখে হাসি দেয়ার জন্যে। টাকা দেয়া ছাড়া তাদেরকে কোন দিন একটু হাসতে দেখা যায় নি।
আরো কিছু দিন যাওয়ার পর প্রকাশনী করার কথা মাথায় আসলো। নতুন আঙ্গিকে ব্যসবাটা শুরু হলো। টাকা দিয়ে টাকার খেলা তৈরি করা যায়। ছোট থাকতে বড়দের মুখে এ কথাটা অনেক শুনলেও কথাটা আস্তে আস্তে মিলতে শুরু করতে থাকে নিজের সাথে।
টাকার পরিমান অনেক ভাবলেও প্রকাশনী করতে তেমন টাকা খরচ হয় নি মতির। প্রকাশনীতে যতো রকমের র'কাগজের দরকার সব মাস শেষে চলে যেতো সরকারী উৎপাদন কেন্দ্র থেকে। নতুন ব্যবসাটা অল্প দিনেই চাঙ্গা হয়ে উঠে। ব্যবসাটা এই অবস্থানে আশার পিছে গল্পকার রশিদ মামুনের ও অবদান মেলা। প্রকাশনী শুরু করার কিছু দিন পর লোকটা আসে কিছু গল্প নিয়ে। তার চোখে মুখে হাজারো স্বপ্ন; যা দেখে মোহিত হই। গল্প গুলো সময় নিয়ে ছয় দিনের মাথায় পড়ে শেষ করি। গল্প'য় আলাদ তেমন কিছু না থাকলেও ব্যাপারটা হচ্ছে তার লেখুনীর জাদুতে। এরকম লেখা পড়ার পর যে কেউ আনন্দিত হতে বাধ্য তার উপর গল্পের মধ্যে কিছু রসালো কথা আর ঘটনার বিবরনী দেয়া ছিলো। এরকম রসালো কথা যে কোন বয়সে পাঠকের মনে সুড়সুড়ি জাগাতেও সক্ষমতা আনবে। সব কিছু ভেবে তার বইটা ছাপানোতে মতো আসে। এই কথা শুনে রশিদ মামুনের ভালো লাগা দেখে নিজেরও সেদিন ভালো লেগেছিলো। নিজেরর মন কে তখন বুঝা দেয়ার মতো একটা যুক্তিও ছিলো; নিজের স্বপ্ন যেখানে জলে গেছে সেখানে অন্যের বাস্তবায়নটা নিজেকে বুঝ দিতে চাইলো- "নিজের না হয় পারা গেলো না তাতে কি হয়েছে, বরং অন্যের স্বপ্নের বাস্তবায়নের হোতা তো হওয়া গেছে"। পরবর্তীতে রশিদ মামুন তো এখানের হিট গল্পকারের তালিকায় নাম লেখায়। তাকে ছাড়া বই মেলা কল্পনাই করা যেতো না। যা ই লিখতো তা পাঠক শ্রেনী লুপে নিতো। প্রকাশনী ব্যবসা থেকে অল্প দিনে হিউজ টাকা আয় হয়ে যায়। যার পরিমানটা যে কারো কল্পনার বাহিরে ছিলো। এরি মধ্যে এক দিন হুট করে রশিদ মামুন মারা যায় তার মৃত্যুর পর থেকে প্রকাশনী ব্যবসা জিমিয়ে পড়ে। একজন যে রাইটার একটা প্রকাশনীর আয়ের বিশাল উৎস হতে পারে তার নমুনা রশিদ সাহেব রেখে গেলেন। অনেক ভেবে চিন্তে এরি মধ্যে আরো অনেক গুলো ব্যবসায় মনোযোগ বসানো হয়। সবখানেই সাফল্যের গল্প। শুরুটা যতোটা কঠিন ছিলো তার পর থেকে উত্থানের গল্প গুলি ততোটা মামুলি ছিলো।
দিন রাত পরিশ্রম আর ব্যবসায়ের কৌশলের জন্যে আজকে মতিকে প্রথম শ্রেনীর একজন শিল্পপতির তালিকায় রাখা হয়। অর্থের পিছু ছুটতে ছুটতে কখন যে পঞ্চাশ পার হয়ে গেলো একটু টের পাওয়া তো দূরের কথা বয়সটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার মতো কেউ ছিলো না তখন। টাকার পিছে ছুটতে গিয়ে প্রথম জিবনে আত্মীয় স্বজন সব হারিয়েছে মতি। তারপর টাকা বানানোর নেশায় ই কেটেছে সময়। অন্যকিছু নিয়ে ভাবার সময় ছিলো কই তখন। ব্যস্ততা তাকে বিয়ে করার সময় টুকু থেকে ও ভুলিয়ে রেখেছে। বিয়ে না করলেও সে যে বিয়ের আগাম কোন স্বাদ গ্রহণ করেন নি তার নিশ্চয়তা দেয়া মুশকিল। একজন শিল্পপতির আশে পাশে রমনী ঘুরাঘুরি করবে না এরকম তো হওয়ার কথা না। অনেকেই চেয়েছে মতির মনে নিজেকে জায়গা করে নিতে কিন্তু সে অনেক টাকার মালিক হলেও সম্পর্কে ব্যাপারে ছিলো বড্ড আনাড়ি। জৈবিক চাহিদা ছাড়াও যে নারী একটা সম্পর্কের কারন হতে পারে এই ব্যাপারে মতি কোন দিন কিছু জেনে উঠতে পারে নি।
মতির কলেজ লাইফে যে দু চার জন বন্ধু ছিলো তারাও কখনো যোগাযোগ রাখেনি। এতে তার ও কখনো আক্ষেপ জাগে নি, বরং সব মিলিয়ে তার পরেও লাইফটা দিব্বি কেটে যাচ্ছে। এখন অবশ্য মতি ব্যবসা নয়, বরং সমাজ সেবায় নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায় বেশী। বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা, সেমিনার, অর্থদান, পাঠাগার তৈরি, স্কুল, হাসপাতালের ফান্ড ম্যানেজ করা নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখে চলেছে। তাইতো দিন শেষে নামের আগে যোগ হয়েছে বিশিষ্ট সমাজসেবক বি.মতি চৌধুরী।
আজকে বহু বছর পর নিজ শহরে ফেরা হচ্ছে। এই শহর এক সময় টাকার অভাবে শহর ছাড়া করেছে আর আজ শহুরে মানুষ গুলাকে সাহায্য করার জন্যেই শহরে পা দিচ্ছে মতি চৌধুরী। কতোটা বছর কেটে গেলো শহর ছাড়া। ইন্টারের পর তো এখানে আশা ই হয় নি। মানুষ আসলে অনেক স্বার্থপর না হলে কেমন করে ভাগ্যের পরিবর্তনে বছরকে বছর নিজের নাড়িরটান ছাড়া বহুদূর দেশ-শহরে কাটিয়ে দিতে পারে!
মুগ্ধতা নিয়ে দু নয়ন চোখ জুড়িয়ে নিচ্ছে স্মৃতির শহরটা। স্মৃতিতে তেমন বিঘাত ঘটে নি চোখে। রেখে যাওয়ার শহর তার আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। উন্নয়নের জোয়ার এখানে হানা দিতে পারে নি। স্মৃতি আর বাস্তবের মিশ্র ঘোর কাটতে না কাটতেই চলে এলো তারা শহরের বড় মাঠটায়। গাড়ি দেখে সবাই চেঁচাচেচি শুরু করলো। এই আনন্দের উচ্ছ্বাসও তখন বিরক্তি নিয়ে আসে কানে। আজকে এখানে জন প্রতি দু হাজার টাকা সাথে কিছু ভালো জামা কাপড় বিলি করা হবে। স্টেইজে উঠে যখন দাঁড়িয়েছে মতি তখনও জনতার স্রোতে থাকা মাঝারি সাইজের মানুষটি তার চালার বস্তাটা বার বার দেখে যাচ্ছে। যখন ই বক্তৃতা শুরু হতে যাবে ঠিক তখন ই মাঝারি সাইজের মানুষটির পাশে থাকা বস্তা থেকে চার পাঁচ জন মানুষ মিলে এক সাথে জুতা বের করা শুরু করছে। হঠাত স্টেইজে জুতার বৃষ্টি শুরু হয়। জুতা নিক্ষেপকারীদের মধ্য থেকে মাঝারি সাইজের লোকটা হাক দিয়ে বলে যাচ্ছে- মতি চোরা তুই আজকে সমাজসেবক হইছিস। তুই তো আস্তো একটা চোর চিলি। বাপে তোরে চাকরি লয়ে দিছে তার লগে; তুই তো আমার বাপরে চোর সাজিয়ে তখন বাহির কইরা দিলি। বাপের অপরাধ ছিলো তোরে চাকরি দেয়া, তোর চুরির প্রতিবাদ করা। তোর জন্যে আমার বাপ সে সময় ই শোকে মারা যায়। বাপ আজকে থাকলে তোর এই নাজেহাল অবস্থা দেখে খুশিই হতো। তোর সব তথ্য ই আমার জানা আছে। এতো বছর এই দিনটার জন্যেই অপেক্ষায় ছিলাম। এতো জোরে হাক দিলেও জনতার স্রোতে কথা গুলো বেশী দূর জেতে পারে নি। এরি মধ্যে পুরো স্টেইজ খালি হয়ে গেছে। মতি চৌধুরী পালিয়ে চলে যায়। স্টেইজে থাকা বড় বড় বাক্স আর টাকার বাণ্ডিল গুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে কাড়াকাড়ি মারামারি চলছে। অল্পক্ষনে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যায়।
হার্টে সমস্যা থাকাতে মতি চৌধুরী ড্রিংকস করা বহু আগে ছেড়ে দিয়েছে। তারপরেও আজকে বহুদিন পর অর্ধেক বোতল এক বসায় গিলে নিয়েছে। তবুও আজকের স্মৃতি ব্রেইন থেকে সরে যাচ্ছে না। ড্রিংকস করার পর থেকে মনে হচ্ছে দিনের মুহুর্ত গুলো এখনো চোখের সামনে খেলা করছে। এই রকম অপমান সে একবারেই সইতে পাচ্ছে না। ড্রিংকস,সিগারেট কিছু কাজে দিচ্ছে না এখন। মানুষের মুখে কতো শুনেছে এরকম মুহূর্তে এই বস্তু গুলো মহাওষুধী হিসেবে কাজ করে। এতো খাওয়ার পরেও নিজেকে এখনো দিব্বি স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। সবকিছু নিয়ে এখন রাগে মাথা থেকে পা পর্যন্ত গিজগিজ করছে শরীর। চোখের সামনে এখান যা ই পড়ছে তা ভাঙ্গলেও দিনের মুহুর্তগুলো ভুলার নয়। আবার বোতলটা সামনে নিয়ে বসলো মতি। পুরো বোতল শেষ করার পর পাশে থাকা ড্রয়ারে বা হাত ঢুকিয়ে কালো কালারের ছোট বস্তুটা বের করে দেখতে শুরু করলো।কালো হলেও বস্তুটা চকচক করছে। বস্তুটা দেখা শেষে চারদিকে এক নজর তাকাতেই চোখ টলমলিয়ে উঠলো। আস্তে আস্তে আবছা অন্ধকার দেখা শুরু করলো। বুঝতে অসুবিধে হয় নি এটা যে এক বোতল পানি হজম করার প্রতিক্রিয়া। টলমলে অবস্থা থেকে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বা হাতে থাকা বস্তুটা হাত থেকে মুখে পুরে নিলো। হঠাত বিকট আওয়াজ হতে ই মতি চৌধুরী ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন। আস্তে আস্তে রক্তে পুরো ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে।
ঘড়িতে সকাল পাঁচটা বাজে। টেবিলে থাকা ছোট ঘড়িতে এঁটে থাকা জোকার মুখায়বটা হেসে যাচ্ছে ঘন্টির তালে তালে। ঘড়ি ঘন্টি বাজাচ্ছে; তার কি আর বুঝ আছে নাহলে সেও আজকে থেকে ঘন্টি বাজানো বন্ধ করতো।
মাহতাব হোসেন
১৪-০৪-১০১৬